ডব্লিউজিসির জরিপ প্রতিবেদন

বৈশ্বিক অস্থিরতা সত্ত্বেও স্বর্ণের মজুদ বাড়াবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান ধাতু স্বর্ণের দাম কমলেও এক বছরের মধ্যে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিজেদের স্বর্ণের মজুদ আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি) তাদের সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও ভূরাজনৈতিক ধাক্কা থেকে নিজেদের আর্থিক খাতকে নিরাপদ রাখতেই মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের মজুদ বাড়াতে চেয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে স্বর্ণকে একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। খবর দ্য ন্যাশনাল।

লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল তাদের ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক গোল্ড রিজার্ভ সার্ভে ২০২৬’ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণের মজুদসংক্রান্ত জরিপ প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেয়া বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে আগামী এক বছরে বৈশ্বিক পর্যায়ে স্বর্ণের মজুদ অনেক বাড়বে। পাশাপাশি জরিপে অংশ নেয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে রেকর্ড ৪৫ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী দিনগুলোয় সরাসরি নিজেদের স্বর্ণের মজুদ বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বিশ্বের মোট ৭৬ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে ৫৮টি ব্যাংক উন্নত অর্থনীতির দেশের এবং ১৮টি ব্যাংক উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশের। আপৎকালীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের ওপর উভয় পক্ষেরই সমান আস্থা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি রিজার্ভ বা বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বর্ণ একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে মনে করে ব্যাংকগুলো। ডব্লিউজিসি জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে এখন বিনিয়োগের প্রধান তিনটি লক্ষ্য—নিরাপত্তা, তারল্য ও রিটার্ন বা মুনাফার গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে।

সাধারণত উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে বিনিয়োগকারীরা আপৎকালীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝোঁকেন। তবে সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়ায় স্বর্ণের দামে কিছুটা পতন লক্ষ করা গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছলেও পরবর্তী সময়ে তা সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রায় ১৮ শতাংশ কমে যায়। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে অবশ্য স্বর্ণের বাজারে আবার কিছুটা ইতিবাচক মোড় বা দামের পুনরুদ্ধার দেখা গেছে।

স্বর্ণের সাময়িক মূল্যহ্রাস সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মূল্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যেকোনো সংকটের সময়ে ভালো কর্মক্ষমতা, পোর্টফোলিও বা বিনিয়োগের বহুমুখীকরণ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি মোকাবেলার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো স্বর্ণ। এছাড়া ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে এবং রিজার্ভের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্বর্ণের পেছনে বেশি বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে দেশগুলো।

স্বর্ণের প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বাড়লেও ডলারের ওপর থেকে আস্থা দিন দিন কমছে। জরিপে অংশ নেয়া প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, পাঁচ বছরের মধ্যে তারা তাদের রিজার্ভে ডলারের পরিমাণ মাঝারি বা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে পারে। তবে ইউরো ও চীনা ইউয়ানের মতো অন্য প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রাগুলোর মজুদ অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে বলে ব্যাংকগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।

ডব্লিউজিসি আরো উল্লেখ করে, ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন অনেক কম আশাবাদী। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যানুযায়ী, বিশ্ববাজারে ডলার এখনো সবচেয়ে প্রভাবশালী রিজার্ভ কারেন্সি বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে টিকে থাকলেও বৈশ্বিক রিজার্ভে এর সামগ্রিক অংশীদারত্ব ধীরে ধীরে কমছে।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের ভৌত বা আসল স্বর্ণ কোথায় জমা রাখছে, সে চিত্রও জরিপে উঠে এসেছে। স্বর্ণ মজুদ রাখার জন্য বিশ্বের ব্যাংকগুলোর কাছে এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান হলো ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। প্রায় ৫৭ শতাংশ ব্যাংক যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্যাংকটিকে পছন্দ করেছে। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নিজ দেশের ভল্ট বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিজস্ব সুরক্ষাগার, যা প্রায় ৪৯ শতাংশ ব্যাংক পছন্দ করে। এছাড়া সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটলমেন্টস ১৬ শতাংশ ব্যাংকের পছন্দ। তবে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের জনপ্রিয়তা আগের ১২ থেকে কমে মাত্র ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিজেদের স্বর্ণের সংরক্ষণের কৌশলেও কিছু পরিবর্তন আনছে। ১২ মাসের মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশ ব্যাংক তাদের স্বর্ণ সংরক্ষণের স্থানগুলোয় বৈচিত্র্য আনার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে ৭ শতাংশ ব্যাংক স্বর্ণের একটি বড় অংশ নিজস্ব দেশের ভল্টে ফিরিয়ে নেয়ার কথা ভাবছে।

সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, বৈশ্বিক সুদহারের পরিবর্তন, অনিশ্চিত মূল্যস্ফীতি ও চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে ঝুঁকি কমানোর জন্য কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়াই এখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুরক্ষার জন্য স্বর্ণ কেনা বাড়ালেও সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে গহনার চাহিদা কমে গেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের চাহিদা রেকর্ড উচ্চতা থেকে নাটকীয়ভাবে কমেছে। মূলত চলমান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বাজার অনিশ্চয়তাই সাধারণ ক্রেতাদের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও